প্রিমিয়ার লিগের দলবদল, অর্ধডজন ক্রিকেটার চান এক কোটি টাকা পারিশ্রমিক!
ক্রিকেটাররা এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টি আসর খেলার জন্য। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৪ অক্টোবর ৮ বিভাগীয় দলকে নিয়ে শুরু হবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের এই আসর।
তারপরই জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচি। প্রথমে দুবাইতে আফগানিস্তানের সাথে এক ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ এবং একই মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ও তিন ম্যাচের ওয়ানডে এবং ২ ম্যাচের টি-২০ সিরিচ। এর মাঝখানেও ভেতরে ভেতরে আরও একটি কার্যক্রম ক্রিকেটারদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কী সেটা? নিশ্চয়ই ভাবছেন কী সেই ক্রিকেটীয় কার্যক্রম, যা ক্রিকেটারদের অবচেতন মনে তাড়া করে বেড়াচ্ছে? সেটা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের দলবদল।
বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল জাতীয় লিগ, বিসিএলের দীর্ঘ পরিসরের পাশাপাশি একদিনের ফরম্যাটেও ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বাড়িয়েছেন। তাতে করে জাতীয় দলের বাইরে মাঝারিমানের একজন ক্রিকেটারেরও বছরে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয়ের পথ খুলেছে; কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা প্রিমিয়ার লিগের দিকে তাকিয়ে। কারণ ১০০ থেকে ১৫০ ক্রিকেটারের বছরের রুটি-রুজিই এই ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ। অনেকেই এই আসরে পাওয়া পারিশ্রমিক দিয়ে সারা বছর চলেন।
আগের বছরগুলোয় মার্চ-এপ্রিল কিংবা কখনো কখনো মে মাসে লিগ মাঠে গড়ালেও অক্টোবরের মধ্যে দল গড়ার কাজ শুরু হয়ে যেত। ক্রিকেটারদের অন্তত ৫০% না হয় এক-তৃতীয়াংশ অগ্রিম পেমেন্ট দিয়ে চুক্তি করে রাখত ক্লাবগুলো। সেখানে এবার লিগ শুরুর কথা ফেব্রুয়ারিতে। মানে লিগ ২ মাস এগিয়ে আসছে। সে আলোকে এখন ভেতরে ভেতরে নতুন বছরে দল গড়ার সেরা সময়; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
এখন পর্যন্ত প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের দলবদল নিয়ে সে অর্থে কোনো সাড়া-শব্দ নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি কারণে এখন পর্যন্ত দলবদল নিয়ে ক্লাবগুলোর আগ্রহ কম। প্রথমত, ক্লাবগুলো এখনো সন্দিহান ফেব্রুয়ারিতে লিগ মাঠে গড়াবে কিনা? যদিও ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের আয়োজক, ব্যবস্থাপক সংগঠন সিসিডিএম নিশ্চিত করেছে এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছে ২০২৭ সালের প্রিমিয়ার লিগ হবে ফেব্রুয়ারিতে। ক্লাবগুলোর সন্দেহ, শেষ পর্যন্ত ওই সময়ে না ঘুরে ফিরে মার্চ-এপ্রিলেই লিগ শুরু হবে। তাই ক্লাবগুলো একটু ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করছে। সেটাও এখন পর্যন্ত দলবদল কার্যক্রম শুরু না হওয়ার একটা কারণ।
পাশাপাশি আরও দুটি কারণে দলবদলে ক্লাবগুলোর তোড়জোড় তুলনামূলক কম। প্রথমত, বেশ কয়েকটি ক্লাবের এবার বাজেট বেশ কম। সেখানে উল্টো ক্রিকেটারদের ডিমান্ড এবার বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৫/৬ জন ক্রিকেটার প্রায় এক কোটি টাকা পারিশ্রমিক দাবি করছেন। এর বাইরে অন্তত ডজন খানেক ক্রিকেটার ৬০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা দর হাঁকাচ্ছেন। তার মানে ২/৩ জন নামী ও সুপ্রতিষ্ঠিত তারকাকে দলে নিতে হলে দেড় কোটি টাকা গুনতে হবে। এই বিশাল অংক দেওয়ার মতো ক্লাব নেই বললেই চলে।
গত লিগে মোহামেডান, আবাহনী, প্রাইম ব্যাংক, লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ মোটামুটি বড় অংকের অর্থ খরচ করে বিগ বাজেটের দল গঠন করেছিল। এর মধ্যে নতুন ও পুরোনো মিলে মোহামেডানেই ছিলেন ১২-১৪ জন জাতীয় ক্রিকেটার। মুশফিকুর রহিম, তাওহীদ হৃদয়, এনামুল হক বিজয়, নাইম শেখ, পারভেজ হোসেন ইমন, আফিফ হোসেন ধ্রুব, রিশাদ হোসেন, ইয়াসির আলী রাব্বি, তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা, এবাদত হোসেন, সাইফউদ্দীন আর তাইজুলের মতো প্রতিষ্ঠিত তারকা ছিলেন মোহামেডানে। তাদের পাশাপাশি উঠতি পেসার মুশফিক হাসান ও রিপন মন্ডলও খেলেছেন সাদা-কালো জার্সি গায়ে।
এতগুলো জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটারকে দলে টানা, খেলানো সহজ কর্ম নয়। এজন্য মোহামেডানকে গুনতে হয়েছে বিপুল অর্থ। জানা গেছে, এখনো গত লিগের পুরো পেমেন্ট করতে পারেনি মোহামেডান। চলতি মাসে তিন তিনবার সময় দিয়েও সমুদয় পাওনা শোধ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
এবার শেষ পর্যন্ত মোহামেডানের লাইনআপ কেমন হবে? এখনই তা বলা কঠিন। পাওনা না পেলে দল ছাড়তে পারেন বেশ কজন ক্রিকেটার। একেতো আগেরবারের বিরাট পাওনা, তার ওপর এবার ক্রিকেটারদের বিশাল অংক ডিমান্ড, দুয়ে মিলে মোহামেডান কর্তারা আছেন বিপাকে। ১৭ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর আগেরবার এক ঝাঁক নামী ও দামি ক্রিকেটার দলে ভিড়িয়ে লিগ ট্রফি ঘরে তুললেও এবার মোহামেডান আগের মতো অত সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দল গড়তে পারবে কিনা, সন্দেহ আছে।
রানার্সআপ আবাহনীরও তেমন সাড়া-শব্দ নেই। মোহামেডানের মতো আবাহনীরও একাধিক ক্রিকেটার প্রায় ১ কোটি টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেছেন। তাদের পাওনা মেটানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আবাহনী অফিসিয়ালসদের।
প্রাইম ব্যাংক আর সিটি ক্লাব তুলনামূলক বিগ বাজেটের দল গড়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে। এ দল দুটির বাজেট মোটামুটি ভালো। কিন্তু লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ, ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো মাঝারি শক্তির দলগুলোর অবস্থা তেমন ভালো না। চূড়ান্ত সাফল্যের দেখা না পেলেও গত এক যুগের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিবারই বেশ ভালো দল গঠন করেছে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ। সাবেক সরকারের আমলে মামলায় পড়ে একটা বড় সময় দেশের বাইরে থেকেও বিগ বাজেটের দল গড়েছেন লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের স্বত্বাধিকারী লুৎফর রহমান বাদল। কিন্তু এবার তিনি উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
সব মিলে ক্রিকেটারদের হাই ডিমান্ড আর ক্লাবগুলোর অর্থনৈতিক মন্দা, দুইয়ে মিলে এবারের প্রিমিয়ার ক্রিকেটের দলবদল অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে। ভেতরের খবর, ক্রিকেটারদের এই হাই ডিমান্ড মেটাতে ক্লাবগুলো নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে দল সাজানোর চিন্তাভাবনা করছে। তাতে করে ক্রিকেটারদের ‘গ্রেডেশন’ করা থাকবে। এ প্লাস, এ, বি, সি, ডি ক্যাটাগরি ভাগ করে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। সেই গ্রেডেশন অনুযায়ী ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে।
এখন যারা ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পারিশ্রমিক দাবি করছেন, তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হতে পারে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকায়। আনুপাতিক হারে ৫০-৬০ লাখ টাকা ডিমান্ড করা ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নেমে আসবে ৪০ লাখে। একইভাবে ৩০-৩৫ লাখ টাকা মূল্য হাঁকানো ক্রিকেটারদের গড়পড়তা পারিশ্রমিত নেমে ২০-২৫ লাখে দাঁড়াবে।
এআরবি/আইএইচএস

