ডিজেলের দাম বাড়ায় ইউক্রেনকে দায়ী করছেন ট্রাম্প, সুবিধা দেখছে মস্কো
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবার, মধ্যবর্তী নির্বাচনের বাকি দুই মাসেরও কম। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নিজের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পুরোনো কৌশলে ফিরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য ইউক্রেনকেই দায়ী করছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন অবস্থান ইউক্রেনের জন্য কঠিন সময়ে এসেছে। একই সঙ্গে, এটি রাশিয়ার জন্য কূটনৈতিক সুবিধার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
গত রোববার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেলেনস্কিকে একটি কাজ করতে হবে। তাকে রাশিয়ায় ডিজেল জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রে হামলা বন্ধ করতে হবে। এটা বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উদ্দেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তেলের বাজারে চাপ, ইউক্রেনের হামলা নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকেরা। টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের অ্যান্ডি লিপোর হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের হামলার জবাবে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় আট লাখ ব্যারেল ডিজেল কম এসেছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল জ্বালানি বাজারের বাইরে চলে গেছে। তাই ইউক্রেন রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করলেই জ্বালানির মূল্যসংকটের সমাধান হবে—এমন দাবি সঠিক নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় কেন হামলা করছে ইউক্রেন
ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে আসছে। কিয়েভের দৃষ্টিতে এসব স্থাপনা রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্র সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষ করে ইউক্রেন যখন রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে রয়েছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতিতে ভুগছে, তখন রাশিয়ার ভূখণ্ডে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা তাদের হাতে থাকা সীমিত পাল্টা ব্যবস্থাগুলোর একটি।
এর মধ্যেই সামনে আসছে শীতকাল। ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে রাশিয়া হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে সুযোগ দেখছে ক্রেমলিন
সোমবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
তবে পরবর্তী বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রস্তাবটিকে ‘খুব ভালো ধারণা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে।
পেসকভ বলেন, রাশিয়া সব সময় শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। তবে একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির ওপর থাকা বিভিন্ন বাধার বিষয়টি সামনে আনেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা এখন প্রায় পূর্ণ। সমস্যা উৎপাদনে নয়, বরং এসব পণ্য নির্বিঘ্নে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ায়।
এরপর পেসকভ রুশ তেলবাহী ট্যাংকারে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গ তোলেন। রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও সামনে আনেন তিনি।
পেসকভের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেই বিশ্বে জ্বালানি পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত পদক্ষেপ
রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে এ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছিল।
তবে একই সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপও নিয়েছে ওয়াশিংটন। চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাশিয়ার অন্যতম বড় একটি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এ ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল নিয়েও মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জীবিত থাকাকালে বিলটির অন্যতম প্রণেতা ছিলেন।
জেলেনস্কির জন্য নতুন করে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মতো কিয়েভ সফর করেন। সেখানে তারা জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা বলেন।
তবে এর আগে ওই প্রতিনিধিরা রাশিয়া সফর করেছিলেন। পরে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বললেও জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপ হয়নি।
ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে বলেন, কিয়েভকে প্যাট্রিয়টের ‘কম উন্নত সংস্করণ’ দেওয়ার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছেন।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশ। ফলে মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দাম কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা নিয়ে যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের রাজনৈতিক চাপও যেমন বাড়ে, তেমনি নিজেদের অর্থনীতি ও ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। রাশিয়ার ওপর কীভাবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো হবে, অথচ সেই চাপের কারণে নিজেদের জ্বালানি বাজার ও সাধারণ মানুষের ব্যয় যেন আরও বেড়ে না যায়—এ ভারসাম্যই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: সিএনএন
কেএএ/





