দাম বেড়েছে সব ধরনের ফিডের, চাপে খামারিরা
দিনাজপুরের বাজারে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত সব ধরনের ফিডের দাম বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে এসব খাবারের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা।
তবে ব্রান ও ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ৫০ মেজির এক বস্তা ব্রান ১৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০০ টাকা, আর ভুট্টা ২৫ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ টাকায়।
প্রান্তিক ও ছোট খামারিদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় এভাবে বাড়তে থাকলে তারা লোকসান সামাল দিতে পারবেন না। অনেকে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন।
তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে তিন হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। মান ও ধরনভেদে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির খাবারের দাম প্রতি বস্তা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কমবেশি রয়েছে।
উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশ ফিডে
খামারিদের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত মুরগির খাবার। কোনো কোনো খামারির হিসাবে, উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চলে যায় খাবারের পেছনে।
বাসুদেব ট্রেডাসের স্বত্বাধিকারী অর্জুন প্রসাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভুট্টার দাম বাড়ায় সব ধরনের ফিডের দাম বেড়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট থাকায় ফিড উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আমাদের বেশি দামে ফিড কিনতে হচ্ছে। ফলে বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে।’
তিনি বলেন, ‘দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রেতা কমে গেছে। ভুট্টার দাম সহনীয় রাখলে ফিডের দাম কমবে। অনেকে সিন্ডিকেট করে ভুট্টা স্টক করে ভুট্টার দাম বাড়াচ্ছেন।’
সাফা ট্রেডাসের স্বত্বাধিকারী আমজাদ হোসেন বলেন, ‘সব কোম্পানির ফিডের দাম বেড়েছে। গত কয়েক মাসে সব ধরনের ফিডে কেজিতে ৩-৫ টাকা বেড়েছে। ফলে বিক্রিও কমেছে। আগে যারা পাঁচ বস্তা ফিড কিনতেন, তারা চার বস্তা কিনছেন। আগে দিনে বিক্রি হতো ৩০ বস্তা, এখন ২৫ বস্তা বিক্রি হয়।’
সদর উপজেলার পাঁচবাড়ি পোল্ট্রি খামারি মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিমাসে ব্রয়লার মুরগির জন্য আমার খাদ্য লাগতো ৭০ বস্তা। কিন্তু দুই ধাপে দাম বাড়ার জন্য এখন ঠিকমতো ব্রয়লার মুরগিকে খাদ্য দিতে পারছি না। এখন ৬০ বস্তা দিতে হচ্ছে। ফলে কাঙিক্ষত ওজন আসছে না। ফলে ভালো দাম পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যে খামার বন্ধ করে দিতে হবে।’
সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা এলাকার মৎস্য খামারি জুয়েল। তিনি বলেন, ফিশ ফিডের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা বেড়েছে। ২০-২৫ দিনের ব্যবধানে এই দাম বেড়েছে। দোকানিরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই ফিশ ফিডের দাম বেড়েছে। ফলে আমাদের চাষের খরচ বাড়ছে।
দেশে ফিড উৎপাদনকারী ২৯৪টি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাঠকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গরুর ফিড প্রকারভেদে কেজিতে দেড় টাকা থেকে দুই টাকা, পোল্ট্রি ফিড দুই টাকা থেকে তিন টাকা, ব্রান কেজিপ্রতি ২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ২৫ টাকা কেজি কজেরি ভুট্টা এক মাসের ব্যবধানে ৩৭ টাকা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সব ধরনের ফিডে ভুট্টা ব্যবহার করতে হয়। এজন্য ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে গো-খাদ্যের মধ্যে খড় ২০টির বান্ডিল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা, গমের ভুসি ৫০ থেকে ৫৫, মটর ডালের ভুসি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে মসুর ডালের ভুসি ৪০, সয়াবিনের খৈল ৬০, ভুট্টার গুঁড়া ৩৪, ভুট্টার ভুসি ৪০, বুটের ভুসি ৬৫, চালের খুদ ৩৫, ধানের কুড়া ১৮, সরিষার খৈল ৫২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
দিনাজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রহিম জানান, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি—এই চার মাস দেশে স্থানীয় ভুট্টার সরবরাহ কম থাকে। এ কারণে সাধারণত এ সময় ভুট্টার দাম বাড়ে। কিন্তু এবার তার আগেই দাম বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমদানি করা ভুট্টার সঙ্গে দেশের ভুট্টা মিশিয়ে ফিড তৈরি করা হয়। এ কারণে কাঁচামালের দাম বাড়ায় ফিডের দাম বেড়েছে।
দিনাজপুর জেলায় গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের ৩৪ হাজার ৫৪০টি খামার রয়েছে। এছাড়া লেয়ার, ব্রয়লার, হাঁস, কবুতর ও কয়েল পাখির খামার রয়েছে তিন হাজার ৭২টি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তারিফুর রহমান সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফিডের দাম বাড়লে মাছের দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। বাজারে কী পরিমাণ দাম বেড়েছে তা আমরা খোঁজ করে জানাতে পারবো।’
সূত্র বলছে, জেলায় বেসরকারি মাছের খামার রয়েছে চার হাজার ২২৫টি, সরকারি হ্যাচারি দুটি। মাছ চাষির সংখ্যা ৪২ হাজার ১২৪ জন। জেলায় মাছের চাহিদা ৯০ হাজার ৭৫৪ মেট্রিক টন। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৭৩ হাজার ৮৭২ মেট্রিক টন। ঘাটতি রয়েছে ১৬ হাজার ৮৮২ মেট্রিক টন।
মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ফিডের দাম বাড়লে মাছের দাম বাড়ে। আর মাছের দাম বাড়লে সব শ্রেণির মানুষের ওপর প্রভাব পড়ে। তাই আমরা চাইবো যত কম খরচে উৎপাদন করা যায়।
বাজারে পড়তে পারে প্রভাব
উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার চাপ মুরগি, ডিম ও মাছের বাজারেও পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের বাজারদর কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসার পর ফিডের এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এরই মধ্যে ডিমের দাম বেড়ে গেছে।
মৎস্য খামারি জুয়েল ইসলাম ও পোল্ট্রি খামারি মোমিনুল ইসলাম বলেন, ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ালে সেই বাড়তি ব্যয় মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প থাকে না। এ কারণে ফিডের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ এবং বাজার তদারকিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
এএমএইচএম/এসআর




