রোনালদোর আল-নাসরও আর ভাঙতে পারবে না রিভার প্লেটের অমর রেকর্ড
রেকর্ড ভাঙার খুব কাছাকাছি গিয়েও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কীর্তিটা ছুঁতে পারল না ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আল-নাসর। সৌদি আরবের ক্লাবটি ঘরোয়া লিগে টানা ৯৪ ম্যাচে অন্তত একটি করে গোল করার কীর্তি গড়ে রিভার প্লেটের ৯৩ ম্যাচের পুরোনো রেকর্ড পেছনে ফেলেছিল; কিন্তু সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে রিভার প্লেটের আরও একটি রেকর্ডকে পেছনে ফেলতে পারলো না আল নাসর। রিভার প্লেটের দখলে যে ৯৬ ম্যাচের বিশ্বরেকর্ড, সেটি এখনো অক্ষত এবং অক্ষতই থেকে যাবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রেকর্ডটি শুধু অক্ষতই নয়, আল-নাসরের পক্ষে তা ছোঁয়াও আর সম্ভব নয়। কারণ সৌদি ক্লাবটি ঘরোয়া লিগের বাইরে এশিয়ান প্রতিযোগিতায় একটি ম্যাচে গোল করতে পারেনি। পরে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগেও বড় ব্যবধানে হেরেছে তারা।
লিগে ৯৪, কিন্তু মোট ৯৬-এর কাছে নয়
আল-নাসরের হয়ে টানা ৯৪ ম্যাচের গোল-ধারার শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। এরপর সৌদি প্রো লিগের প্রতিটি ম্যাচেই অন্তত একবার জালের দেখা পেয়েছে তারা।
গত শনিবার আল-খালিজের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার ম্যাচে সেই ধারাটি ৯৪ ম্যাচে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে যে কোনো ঘরোয়া লিগে রিভার প্লেটের টানা ৯৩ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড নিজেদের করে নেয় আল-নাসর।
কিন্তু এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য। রিভার প্লেটের রেকর্ড শুধু কোনো একটি লিগের নয়। আর্জেন্টাইন ক্লাবটি ১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৩৯ সালের জুন পর্যন্ত সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৯৬টি অফিসিয়াল ম্যাচে অন্তত একটি গোল করেছিল। এই ৯৬ ম্যাচের মধ্যে ছিল ৯৩টি লিগ ম্যাচ, দুটি আন্তর্জাতিক কাপের ম্যাচ এবং একটি ঘরোয়া কাপের ম্যাচ।
অর্থাৎ লিগের হিসাব ধরলে আল-নাসর রিভারের ৯৩ ম্যাচকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু সব প্রতিযোগিতা একসঙ্গে ধরলে রিভার প্লেটের ৯৬ ম্যাচ এখনো সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।
যে ম্যাচটি আল-নাসরের পথ আটকে দিলো
রিভারের ৯৬ ম্যাচের রেকর্ডে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আল-নাসরের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গত মে মাসের একটি ম্যাচ। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগ টু-এর ফাইনালে জাপানের গাম্বা ওসাকার কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল আল-নাসর। অর্থাৎ ঘরোয়া লিগে তাদের গোলের ধারাবাহিকতা চললেও সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে গোল করার রেকর্ডে এরই মধ্যে ছেদ পড়ে গেছে।
ফলে পরবর্তী সময়ে লিগে ৯৪ ম্যাচের ধারাকে আরও বাড়ালেও রিভার প্লেটের ৯৬ ম্যাচের সামগ্রিক রেকর্ডে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই আল-নাসরের।
এরপর মঙ্গলবার এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগে আল-আইনের কাছে ৪-০ গোলে হেরেছে রোনালদোর দল। ফলে রিভারের রেকর্ড ছোঁয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটিও কার্যত শেষ।
রিভার প্লেটের সেই অবিশ্বাস্য সময়
১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯- রিভার প্লেটের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল সময় ছিল এটি। তখনো তাদের বিখ্যাত ‘লা মাকিনা’ আক্রমণভাগের যুগ পুরোপুরি শুরু হয়নি। কিন্তু দলটি ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনার পেশাদার ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছিল।
এই সময়ের মধ্যে রিভার প্লেট জিতেছিল ছয়টি শিরোপা- ১৯৩৬ ও ১৯৩৭ সালের চ্যাম্পিয়নশিপ কাপ, ১৯৩৬ গোল্ড কাপ, ১৯৩৭ ইবারগুরেন কাপ এবং ১৯৩৭ ও ১৯৩৮ সালের আলদাও কাপ।
গোল করার সেই অবিশ্বাস্য ধারাটি শুরু হয়েছিল ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৬। আগের সপ্তাহে হুরাকানের কাছে ১-০ গোলে হারের পর ঘরের মাঠে ফেরোর বিপক্ষে ৩-২ জয়ে নতুন ধারার সূচনা করে রিভার।
এরপর একে একে পেরিয়ে যায় ১৯৩৭, ১৯৩৮ এবং ১৯৩৯ সালের প্রথমার্ধ। প্রতিটি অফিসিয়াল ম্যাচেই অন্তত একবার প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠায় তারা।
শেষ পর্যন্ত ৪ জুন ১৯৩৯, সাভেদ্রায় প্লাতেন্সের বিপক্ষে ৪-১ জয়ের পর থামে সেই ধারাবাহিকতা। পরের সপ্তাহে, ১১ জুন মনুমেন্টালে বোকা জুনিয়র্সের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় রিভার। ওই ম্যাচেই অ্যাডলফো পেদেরনেরার একটি পেনাল্টি বাঁচিয়ে দেন বোকা গোলরক্ষক হুয়ান এসত্রাদা।
পেদেরনেরা সেই পেনাল্টি গোল করতে পারলে রিভারের ধারাবাহিকতা আরও দীর্ঘ হতে পারত। পরবর্তী সময়ে তারা আবারও টানা গোল করেছিল, যা চলেছিল ১৯৪০ সালের জুন পর্যন্ত।
রিভার প্লেটের এই রেকর্ডের আরেকটি বিশেষত্ব হলো- এটি তৈরি হয়েছিল ক্লাবটির স্টেডিয়াম বদলের সময়। রেকর্ডের শুরুতে রিভার খেলত টাগলে ও লিবার্তাদোরের পুরোনো কাঠের স্টেডিয়ামে। ১৯৩৭ সালের ৫ নভেম্বর সেখানে শেষবারের মতো ম্যাচ খেলে তারা।
এরপর নতুন মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় নিজেদের মাঠ না থাকায় প্লাতেন্স, সান লরেঞ্জো ও হুরাকানের মাঠ ভাড়া করে খেলতে হয়েছিল রিভারকে। ১৯৩৮ সালের ২৯ মে নতুন মনুমেন্টালে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষেক হয় তাদের। অর্থাৎ পুরোনো মাঠ থেকে নতুন মাঠে যাওয়ার সেই পরিবর্তনের মধ্যেও গোল করার ধারায় কোনো ছেদ পড়েনি।
৯৬ ম্যাচে ৩১৬ গোল!
রিভার প্লেটের সেই ৯৬ ম্যাচে শুধু গোল করাই নয়, প্রতিপক্ষের ওপর রীতিমতো গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল তারা। ৯৬ ম্যাচে তাদের মোট গোল ছিল ৩১৬টি। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড়ে ৩.২৯ গোল। এই সময়ে রিভার জিতেছিল ৭২টি ম্যাচ, ড্র করেছিল ১৩টি এবং হেরেছিল মাত্র ১১টি। অর্থাৎ জয়ের হার ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ।
এই ধারার মধ্যে দুটি বড় জয় ছিল ফেরোর বিপক্ষে ৮-০ এবং এস্তুদিয়ান্তেসের বিপক্ষে ৮-১। এস্তুদিয়ান্তেসের বিপক্ষে সেই ম্যাচে রিভারের খেলোয়াড়রা ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি পেনাল্টি মিস করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি ভুলভাবে দেওয়া হয়েছিল।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছিলেন পেউসেলে
রিভার প্লেটের ৯৬ ম্যাচের এই দীর্ঘ যাত্রায় সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছিলেন কার্লোস পেউসেলে। তিনি খেলেছিলেন ৯৩টি ম্যাচ। দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন হোসে ম্যানুয়েল মোরেনো, তার গোল ৭৯টি। এরপর ছিলেন বার্নাবে ফেরেইরা ৬০, লুইস রোঙ্গো ৪৯, কার্লোস পেউসেলে ৪২ এবং অ্যাডলফো পেদেরনেরা ৩৭ গোল নিয়ে। এই সময় রিভারের কোচ ছিলেন হেমেরিকো হির্শল ও রেনাতো চেজারিনি। হির্শল দায়িত্বে ছিলেন ৮৩ ম্যাচে, চেজারিনি ১৩ ম্যাচে।
শুধু রিভারই নয়, আরও যারা কাছাকাছি গিয়েছিল
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা গোল করার ক্ষেত্রে রিভার প্লেটের ৯৬ ম্যাচের রেকর্ডের কাছাকাছি আরো কয়েকটি দল গিয়েছিল। কিন্তু কেউই সেই সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।
২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বায়ার্ন মিউনিখ টানা ৮৫ ম্যাচে গোল করেছিল। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে সাও পাওলো করেছিল ৮২ ম্যাচে গোল। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে পেলের সান্তোস এবং ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ- দুই দলই টানা ৭৩ ম্যাচে গোল করেছিল।
পর্তুগালের লিগে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বেনফিকা টানা ৯৩ ম্যাচে গোল করেছিল। তবে সেটিও ছিল কেবল ঘরোয়া লিগের হিসাব।
সেই জায়গায় রিভার প্লেটের ৯৬ ম্যাচের কীর্তি আরও আলাদা। এটি কোনো নির্দিষ্ট লিগের রেকর্ড নয়; ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক- সব অফিসিয়াল প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৯৬ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড।
আল-নাসর তাই লিগে রিভারের ৯৩ ম্যাচের রেকর্ড পেরিয়ে গেলেও ইতিহাসের সামগ্রিক রেকর্ডে পৌঁছাতে পারেনি। রোনালদো, সাদিও মানে, হোয়াও ফেলিক্স, কিংসলে কোমানের মতো তারকায় সমৃদ্ধ দলটির সামনে এখন ঘরোয়া লিগের ধারাবাহিকতাকে আরও দীর্ঘ করার সুযোগ আছে। কিন্তু রিভার প্লেটের ৯৬ ম্যাচের অমর রেকর্ডটি আপাতত নিরাপদেই থাকছে।
আইএইচএস/

