অবুঝ রায়হানের পা কেটে বানানো হয় ‘ভিক্ষার মেশিন’
বাড়ি থেকে অভিমান করে বের হওয়ার পর সাত মাস নিখোঁজ ছিল ১২ বছরের কিশোর মোহাম্মদ রায়হান। অনেক খোঁজাখুঁজির পর স্বজনরা যখন তাকে ফিরে পেলেন, তখন তার ডান পা নেই। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত। পেটে-মাথায় কাটা দাগ।
গত কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় রায়হান নামে এক কিশোরের সাত মাস পর পরিবারের কাছে ফেরার ঘটনা। চারিদিকে শিশু নিখোঁজ-অপহরণের ঘটনার মধ্যে এ ঘটনাটি বেশ সাড়া ফেলে। কয়েকটি ভিডিওতে ভিন্ন তথ্যও পাওয়া যায়। রায়হান একেক সময় একেক কথা বলেছে।
পা হারিয়ে ঘরে ফেরা রায়হান/ছবি: জাগো নিউজ
আসলে কী ঘটেছিল রায়হানের সঙ্গে, তা জানতে সরেজমিনে নোয়াপাড়া গিয়ে জানা যায় প্রকৃত ঘটনা। রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাকে ঢাকার কমলাপুরে আটকে রেখে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামায়। পানি বিক্রি করে আয় কম হওয়ায় একপর্যায়ে ভিক্ষা করানোর জন্য তার ডান পা কেটে ফেলা হয়।

শিশুরা হারিয়ে যায়, কেউ ফেরে কেউ ফেরে না
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকায় ঐতিহ্যবাহী সিরাত মাহফিলের পাশে এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা রায়হানকে দেখতে পান। পরে খবর দেওয়া হয় তার পরিবারকে। খবর পেয়ে বাবা নাজিম উদ্দীন সেখানে গিয়ে ছেলেকে শনাক্ত করেন।
রায়হান চুনতি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার দিনমজুর নাজিম উদ্দীনের ছেলে। সে স্থানীয় একটি তাহফিজুর কোরআন হিফজখানার ছাত্র ছিল।
যেভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়
পরিবারের সদস্যরা জাগো নিউজকে জানান, চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি চুল কাটার জন্য বাবা ১০০ টাকা দেন রায়হানকে। পরে অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় সে। একপর্যায়ে একটি নির্বাচনি প্রচারণার ট্রাকে করে কক্সবাজারে যায়। সেখানে প্রায় দুই মাস সৈকত এলাকায় থেকে পর্যটকদের কাছে টাকা চাইতো এবং তা দিয়ে খাবার কিনে খেতো। রাতে সৈকত এলাকাতেই ঘুমাতো।

তার পরিবারের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন রায়হান পাশেই ছিল। সে আলোচনায় যোগ দিয়ে এর পরের ঘটনা সে নিয়েই বর্ণনা করে। জানায়, পরে এক ব্যক্তি তাকে বেশি টাকা উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে বাসে করে ঢাকায় নিয়ে যায়। এরপর কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় পানি ও শরবত বিক্রি করানো হতো তাকে দিয়ে।
কমলাপুরে অন্ধকার আস্তানা
রায়হানের দাবি, কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছাকাছি গাছপালা ঘেরা একটি টিনের ঘরে তাকে রাখা হতো। সেখানে তার মতো আরও বেশ কয়েকজন শিশু ছিল। তাদের মধ্যে কারও হাত, কারও পা কাটা ছিল।
তার মতে, সালমা নামে এক নারীসহ আরও কয়েকজন ওই শিশুদের দেখভাল করতেন। সকালে শিশুদের বিভিন্ন কাজে পাঠানো হতো। রায়হানসহ কয়েকজনকে রাখা হতো কমলাপুর এলাকায় পানি ও শরবত বিক্রির জন্য। তবে পানি বিক্রি করে আয় কম হওয়ায় একপর্যায়ে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয় বলে অভিযোগ রায়হানের।
‘সকালে উঠে দেখি পা নেই’
রায়হানের দাবি, একদিন রাতে তাকে পানি বা শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ জাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়। এরপর প্রচণ্ড ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে সে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে তার ডান পা কাটা।
রায়হান জানায়, প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরানোর পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ট্রেন দুর্ঘটনায় পা কাটা গেছে এমন কথা বলতে শেখানো হয়েছিল।

চিকিৎসার পর তাকে একটি হুইলচেয়ার দেওয়া হয়। এরপর ওই হুইলচেয়ারে বসিয়ে কমলাপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করানো হতো বলে অভিযোগ তার। ভিক্ষা করে পাওয়া টাকা চক্রের সদস্যরা নিয়ে যেত।
রায়হান জানায়, পা ভালো থাকা অবস্থায় পানি ও শরবত বিক্রি করে দিনে ৬শ থেকে এক হাজার টাকা আয় হতো। আর পা কাটার পরে হুইলচেয়ারে করে দিনে আয় হতো দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। যার পুরোটাই নিয়ে নিতো ওই চক্র।
৭ মাস পর বাড়ি ফেরা
রায়হান জানায়, গত শনিবার রাতে চক্রের এক সদস্য তাকে ৩৫০ টাকা দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলে। পরে ঢাকায় একটি বাসে তুলে দেওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকায় আসে সে।
স্থানীয়রা তাকে মাহফিল এলাকায় দেখতে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। পরে বাবা গিয়ে ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
সুস্থ-সবল অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হওয়া ছেলেকে এক পা হারানো অবস্থায় ফিরে পেয়ে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, আমার সুস্থ-সবল ছেলেকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। তার ডান পা কেটে ফেলেছে। পেটের ডান পাশে ও পেছনেও ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সত্য উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
বাবার সঙ্গে রায়হান/ছবি: জাগো নিউজ
পেটে কাটা দাগ দেখে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) লোহাগাড়া হাসপাতালে নেওয়া হয় রায়হানকে। কিডনি আছে কি না সেটা পরীক্ষা করা ছিল উদ্দেশ্য।
রায়হানের বাবা বলেন, ডাক্তার পরীক্ষা করে বললো কিডনি ঠিক আছে। কিডনির কোনো সমস্যা নেই।
রায়হানের বাবার আর্থিক অবস্থা মোটেই ভালো না। থাকে জরাজীর্ণ একটি টিনশেড বাড়িতে। রায়হানের মায়ের সঙ্গে তার বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বেশ আগে। তখন সে ছোট। তার নিজের আছে আরও দুই ভাই-বোন। মায়ের সঙ্গে থাকে একজন। তারা দুজন ছিল তার বাবার সঙ্গে। সৎ মায়ের ঘরে আছে আরও দুই ভাই-বোন। এর মধ্যে রায়হানের এই অবস্থা নিয়ে বিপাকে তার পরিবার।
রায়হানের সৎ মা ফয়জুন্নেসা বলেন, ‘চুল কাটতে গিয়ে সাত মাস আর বাড়ি ফিরলো না ছেলেটা। এখন ফিরে পেয়েছি, কিন্তু তার একটি পা নেই। পেটেও বড় কাটার দাগ। আমরা গরিব মানুষ, অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চলে। এখন ছেলেটার জীবন কে ফিরিয়ে দেবে।’
‘পুরো চক্রের বিচার চাই’
রায়হানের চাচা মো. নুরুচ্ছফা বলেন, নিখোঁজ হওয়ার পর আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। একদিন তাকে ফিরে পাবো, সেটা আশা ছিল। কিন্তু এভাবে ফিরে পাবো, কখনো ভাবিনি। কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল, কীভাবে তার পা কেটে দেওয়া হলো সবকিছু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
পা হারিয়ে ৭ মাস পর ঘরে ফেরা রায়হান/ছবি: জাগো নিউজ
তিনি আরও বলেন, ‘এটা শুধু আমার ভাতিজার বিষয় নয়। এ ধরনের ঘটনা যেন আর কোনো শিশুর সঙ্গে না ঘটে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা পুরো চক্রের বিচার চাই। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এটার বিচার চাই।’
এসময় পরিবারের পক্ষ থেকে রায়হানের চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনে সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতাও কামনা করা হয়।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
এ বিষয়ে চুনতি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. ইনতেজার জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাত মাস নিখোঁজের পর রায়হানকে ফিরে পেয়ে তার শারীরিক অবস্থা দেখে আমরা অবাক হয়ে গেছি। একটি শিশু কীভাবে সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর এক পা হারিয়ে বাড়ি ফিরল, বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঘটনাটি সঠিকভাবে তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।’

শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে কোথায়, কেন?
জাতীয় লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের প্যানেল আইনজীবী মো. নওশাদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘অভিযোগটি সত্য হলে মানবপাচার, অপহরণ, অঙ্গহানি ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের বিষয় জড়িত থাকতে পারে। দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘শিশুটির শারীরিক অবস্থার বিষয়ে যথাযথ মেডিকেল ও ফরেনসিক পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি শিশুটির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করলে চক্রটির অন্য সদস্যদেরও শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।’
থানায় অভিযোগের বিষয়ে যা বলছে পুলিশ
লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীর বাবা থানায় এসেছিলেন। যেহেতু ঘটনাটি লোহাগাড়ায় ঘটেছে কি না জানা যায়নি, তাই তাকে ঘটনাস্থল মতিঝিল থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিশুটির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করলে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
রায়হানের পরিবারের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে তাকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছিল, কারা তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং কীভাবে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে- এসবের রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। আমাদের বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেহেতু আমাদের এলাকার, তিনি একটু সুদৃষ্টি দিলে এ ঘটনা উদঘাটন করা সম্ভব বলে দাবি পরিবারের।
এমআরএএইচ/এএসএ


