জনপ্রতিনিধির অভাবে ভোগান্তিতে রাজশাহীর ৭২ ইউনিয়নের মানুষ

Direct Source Verification: This story is aggregated from Jago News 24 (jagonews24.com). Full reporting rights and copyright belong to the primary publisher.
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রমের গতি কমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার সাধারণ মানুষ। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত চেয়ারম্যান বা সদস্যকে না পেয়ে অনেককেই ফিরে যেতে হচ্ছে। ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি, নাগরিক সনদ, বিভিন্ন প্রত্যয়...

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রমের গতি কমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার সাধারণ মানুষ। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত চেয়ারম্যান বা সদস্যকে না পেয়ে অনেককেই ফিরে যেতে হচ্ছে। ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি, নাগরিক সনদ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্রসহ প্রয়োজনীয় সেবা পেতে একাধিকবার পরিষদে যেতে হচ্ছে অনেক নাগরিককে। কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা উপস্থিত থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে অনেক সেবা আগের মতো সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় রাজশাহীর ৯টি উপজেলার ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চালু থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি এবং ছোটখাটো সমস্যা ও বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাভাবিক ব্যবস্থায় দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ফলে গ্রামীণ মানুষের কাছে সবচেয়ে কাছের সরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে আগের চেয়ে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করছেন।

তবে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে সচল রয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে বর্তমানে ৬৭টিতে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাকি পাঁচটি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম নেই। ফলে অধিকাংশ ইউনিয়নে স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম ধীরগতিভাবে হলেও অব্যাহত রয়েছে।

‌‌‘চে‌য়ারম্যান না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যের মাধ্যমে গ্রাম আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও অধিকাংশ ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালু রয়েছে।’

জেলা প্রশাসনের মতে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজশাহীর সক্রিয় গ্রাম আদালতগুলোতে মোট ৯ হাজার ৩৪৯টি মামলা এসেছে। এর মধ্যে আগের অপেক্ষমাণ মামলা ছিল ৩৩৭টি। ইউনিয়ন পরিষদে নতুন করে দায়ের হয়েছে ৮ হাজার ৪১৮টি মামলা। এছাড়া জেলা আদালত থেকে গ্রাম আদালতে পাঠানো হয়েছে ৫৯৪টি মামলা। এসব মামলার মধ্যে ৯ হাজার ২০৮টি নিষ্পত্তি হয়েছে। আর ১৪১টি মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

এদিকে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও সক্রিয় গ্রাম আদালতগুলোতে আসা প্রায় ৯৮ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গ্রাম আদালতের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু গ্রাম আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হার দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সামগ্রিক সেবার চিত্র বোঝা যাবে না। কারণ গ্রাম আদালতের বাইরে জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব ও বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র, স্থানীয় বিরোধের প্রাথমিক সমাধান, সরকারি সহায়তা ও বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমসহ ইউনিয়ন পরিষদের রয়েছে বহুমুখী সেবা।

‘গ্রাম আদালতকে আরও কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রাম আদালত পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পৃথক সেন্ট্রাল ডেস্ক, জেলা পর্যায়ে জেলা ডেস্ক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা ডেস্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক বাজেট রাখার প্রয়োজন রয়েছে।’

রাজশাহীর বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে আগের মতো সহজে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না অনেকেই। স্থানীয় কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা, পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ কিংবা সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খোঁজে একাধিকবার পরিষদে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে যাতায়াতসহ নানা ধরনের অতিরিক্ত খরচও হচ্ছে।

বাগমারা উপজেলার হামিরকুৎসা ইউনিয়নের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, আগে ইউনিয়ন পরিষদে গেলেই চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পাওয়া যেত। কোনো সমস্যা হলে সরাসরি তাদের সঙ্গে কথা বলা যেত। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা স্থানীয় কোনো সমস্যা নিয়ে কার কাছে যেতে হবে, সেটিও সহজে জানা যেত। এখন অনেক ক্ষেত্রে কার কাছে গেলে সমস্যার সমাধান হবে, সেটিই বুঝতে পারেন না। স্থানীয়ভাবে যে সমস্যার সমাধান হওয়ার কথা, সেটিও অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বাঘা উপজেলার নুরেছা বেগম বলেন, গ্রামের মানুষের জন্য রাজশাহী শহরে গিয়ে আদালতে মামলা করা সহজ না। আদালতে যেতে হলে যাতায়াতের পাশাপাশি আইনজীবীসহ বিভিন্ন খরচ রয়েছে। গ্রাম আদালত ঠিকভাবে কার্যকর থাকলে স্থানীয় পর্যায়েই অনেক বিরোধের সমাধান করা সম্ভব। এতে সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হয়।

ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ আগের মতো সহজে নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারছেন না। অনেক সময় একটি ছোট কাজের জন্যও পরিষদে একাধিকবার যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে। জনগণের ভোগান্তি কমাতে সরকারকে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ফিরিয়ে আনা উচিত।

পবা উপজেলা বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ আগের মতো সহজে নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারছেন না। অনেক সময় একটি ছোট কাজের জন্যও পরিষদে একাধিকবার যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে। জনগণের ভোগান্তি কমাতে সরকারকে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ফিরিয়ে আনা উচিত।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে প্রশাসনিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হলেও জনগণের অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহির জায়গায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ ও সমস্যা শুনে স্থানীয় পর্যায়ে সমাধানের উদ্যোগ নেন। তাদের অনুপস্থিতিতে সেই সরাসরি যোগাযোগের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চললেও জনগণের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক আগের মতো কার্যকর থাকে না।

তাদের মতে, গ্রাম আদালতে বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে বিকল্প ব্যবস্থায় স্থানীয় বিচার কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের সামগ্রিক সেবার ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প তৈরি করা কঠিন। তাই একদিকে গ্রাম আদালতের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল ও বাজেট নিশ্চিত করতে হবে; অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও জরুরি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ড. স্বপ্নীল রহমান বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে না থাকায় বর্তমানে বিকল্প ব্যবস্থায় কার্যক্রম চলছে। এতে প্রশাসনিকভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হলেও জনগণের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের মতো সরাসরি যোগাযোগ ও সমস্যাগুলো জানার সুযোগ থাকছে না। দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিকল্প তৈরি করা কঠিন। তাই সরকারকে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নাগরিকরা তাদের প্রাপ্য সেবা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচিত চেয়ারম্যান না থাকলেও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম যেন বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থায় আদালতের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যের মাধ্যমে গ্রাম আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও অধিকাংশ ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা বলেন, চেয়ারম্যান না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যের মাধ্যমে গ্রাম আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও অধিকাংশ ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালু রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গ্রাম আদালতকে আরও কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রাম আদালত পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পৃথক সেন্ট্রাল ডেস্ক, জেলা পর্যায়ে জেলা ডেস্ক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা ডেস্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক বাজেট রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

এনএইচআর/এএসএম

Original Source
https://www.jagonews24.com/country/news/1157711
Visit Jago News 24 ↗
SHARE STORY:
𝕏 f in

Related Coverage in Culture